মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০৯ অপরাহ্ন

শিরোনাম
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সৌদি রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ পানিসম্পদ মন্ত্রীর সাথে জার্মানির রাষ্টদূতের সাক্ষাৎ সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ: সেলিমা রহমানসহ অভিজ্ঞ নেত্রীদের অগ্রাধিকার বাকেরগঞ্জে অচল স্লুইসগেটে কৃষিতে বিপর্যয় উন্নয়নমূলক কাজে ইউনিয়নভিত্তিক কমিটি গঠন করা হবে : ডেপুটি স্পীকার রাজধানীর খেলার মাঠ উন্নয়নে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে পরিদর্শন টিম বাকেরগঞ্জে ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার জনগণের অধিকার বাস্তবায়নই আমাদের লক্ষ্য : ডেপুটি স্পীকার সংস্কৃতি মন্ত্রী–ইতালি রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ: সহযোগিতা জোরদারের প্রত্যয় “সংস্কৃতি হলো একটি জাতির আত্মা” : সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী
হঠাৎ কেন  কৃষিঋণ মওকুফের তথ্য চায় বাংলাদেশ ব্যাংক?

হঠাৎ কেন  কৃষিঋণ মওকুফের তথ্য চায় বাংলাদেশ ব্যাংক?

নিজস্ব প্রতিবেদক : ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ও পল্লি ঋণের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে ব্যাংকগুলোর কাছে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এই উদ্যোগ সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। বিষয়টি ঘিরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরেই তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা ও প্রশ্ন।

গত বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) অফিস সময় শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগ থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে চিঠি পাঠানো হয়। এতে রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টার মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ও পল্লি ঋণের মোট আসল, সুদ বা মুনাফা এবং বকেয়া স্থিতির তথ্য পাঠাতে বলা হয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যের ‘জরুরি নির্দেশনা’র পরিপ্রেক্ষিতেই এ তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ ভিত্তিক তথ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠাতে ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়।’’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘‘পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যের চাহিদার ভিত্তিতে এই তথ্য চাওয়া হয়েছে।’’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘‘ডিরেক্টর স্যারের নির্দেশেই ১০ হাজার টাকার নিচের কৃষিঋণের তথ্য চাইতে বলা হয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ীই ব্যাংকগুলোকে ই-মেইল করা হয়েছে।’’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্দেশনা দেওয়া ওই পরিচালক হলেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণের চেয়ারপারসন।

অপরদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘‘ব্যাংকগুলোর কাছে কৃষিঋণের তথ্য চাওয়া হয়েছে কিনা, বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি খোঁজ নিয়ে দেখবো।’

একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বলেন, ‘‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিতই আমাদের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য চায়। কিন্তু এবার প্রক্রিয়াটি কিছুটা ভিন্ন ছিল। খুব অল্প নোটিশে, ই-মেইলের মাধ্যমে এই তথ্য চাওয়া হয়েছে।’’

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। সাধারণত সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে নির্বাহী পরিচালক, ডেপুটি গভর্নর হয়ে গভর্নরের কাছে নোট উপস্থাপন করা হয় কিংবা পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা হয়। তবে এক্ষেত্রে সে ধরনের কোনও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসৃত হয়নি।

উল্লেখ্য, রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে দীর্ঘ ২২ বছর পর অনুষ্ঠিত বিএনপির বিশাল জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান কৃষকদের জন্য ঋণ মওকুফসহ একগুচ্ছ আর্থিক প্রতিশ্রুতি ঘোষণার পরপরই তৎপর হয়ে ওঠে বাংলাদেশ ব্যাংক। কৃষিঋণ মওকুফ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য দ্রুত পাঠাতে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক—যা ঘিরে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে।

গত ২৯ জানুয়ারি রাজশাহীর জনসভায় তারেক রহমান ঘোষণা দেন, ‘‘বিএনপি সরকার গঠন করলে কৃষকদের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে।’’ পাশাপাশি তিনি কৃষকদের জন্য ‘কৃষি কার্ড’ এবং দুস্থ পরিবারের নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রতিশ্রুতি দেন। উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে কৃষিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলার একটি রোডম্যাপও তুলে ধরেন তিনি।

ঘোষণার পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা

জনসভা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগে তৎপরতা লক্ষ করা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কৃষি ও পল্লিঋণের মোট পরিমাণ, মূল টাকা, সুদ বা মুনাফা এবং ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বকেয়ার বিস্তারিত হিসাব দ্রুত পাঠাতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগ (ডিভিশন-১) থেকে পাঠানো এক ই-মেইলে বলা হয়, বোর্ড অব ডিরেক্টরসের একজন সম্মানিত সদস্যের জরুরি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ও পল্লি ঋণের মূলধন, সুদ/মুনাফা এবং বকেয়ার তথ্য আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সকাল ১১টা ৫৯ মিনিটের মধ্যে নির্ধারিত দুটি সরকারি ই-মেইল ঠিকানায় পাঠাতে হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের এমডি বলেন, ‘‘আমাদের ব্যাংকে ১০ হাজার টাকার নিচে কৃষি ঋণ নেওয়া গ্রাহক ৩০ হাজারের বেশি। এসব ঋণের বিপরীতে বকেয়া প্রায় ৫০ কোটি টাকা। আমরা এমনিতেই এই টাকা আদায় করতে পারছি না। এর মধ্যে যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ঋণ মওকুফের চাপ আসে, তাহলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এগুলো তো আমানতকারীদের টাকা—চাইলেই মওকুফ করা যায় না।’’

প্রথম প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘‘কৃষি ভর্তুকি ও অন্যান্য সহায়ক সুবিধা বাদ দিয়ে এভাবে ঋণ মওকুফের সংস্কৃতি চালু হলে দীর্ঘমেয়াদে প্রান্তিক কৃষক কতটা উপকৃত হবে, সেটাও ভেবে দেখা দরকার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ধরনের অপেশাদার আচরণ নতুন নয়। বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি তাদের পক্ষপাতিত্ব বারবার দৃশ্যমান হয়েছে।’’

ঘটনাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

অস্বাভাবিক তৎপরতা?

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এখনও নির্বাচন হয়নি, সরকার পরিবর্তন হয়নি, এমনকি তারেক রহমান রাষ্ট্রের কোনও সাংবিধানিক বা নির্বাহী পদেও নেই। এমন বাস্তবতায় একটি রাজনৈতিক ঘোষণার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন ত্বরিত পদক্ষেপ অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে।”

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘‘সাধারণত সরকার গঠনের পর বাজেট বা নীতিগত নির্দেশনার আলোকে এ ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতর থেকে এমন নির্দেশনা আসা বিরল ঘটনা।’’

প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষকরাও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা জারি হলে—তা প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

একজন বিশ্লেষক বলেন, “নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি হিসেবে যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্য সংগ্রহ শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যতে তা রাজনৈতিক চাপের নজির হয়ে থাকতে পারে।”

রাজনীতির উত্তাপ, অর্থনীতিতে প্রতিফলন

জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থান শেষে তারেক রহমানের দেশে ফেরা, ধারাবাহিক জনসভা এবং উচ্চমাত্রার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রাজনীতির মাঠকে যেমন উত্তপ্ত করছে, তেমনই তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে অর্থনীতির নীতিনির্ধারণী অঙ্গনেও।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2022 shadhindiganta.com
কারিগরি সহযোগিতায়: